দাগী
ঢাকার বাজার ঠাঠারি বাজার।
ঠাঠারি বাজারই বটে। কানে তালা লেগে যেতো এখানে। পিতল কাঁসার বাসন তৈরী হতো। ঠন ঠন ঠাঁইঠাঁই ঠনাঠন। এই ঠনাঠনঠনের সঙ্গে তাল দিতেই বুঝিবা ঢাকা শহরের এই এলাকায় গোটা কয়েক স্টীল ট্রাঙ্ক তৈরীর ছোট ছোট কারখানা ঘর চালু হয়েছিল। ঠাঁই ঠাঁই ঠনাঠনের সঙ্গে একটা বাড়তি শব্দ যোগ হয়েছিল। চড় চড় চড়াৎ।
হারমোনিয়মের চড়া পর্দার রীড টেপার মতো গলা চড়িয়ে কথা বলার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল কারখানাগুলোর তাবৎ কর্মীদের। এই চড়া পর্দাতেই হরদম কথা বলার রেওয়াজ এমনকি খরিদ্দারদেরও। ঠন ঠন ঠাঁই ঠাঁই। চড় চড় চড়াৎ। সামনের ঘরটিতে বসে মহাজন আর তার সহকারী। খরিদ্দারেরা এখান থেকে কেনে স্টীল ট্রাঙ্ক। কয়েকটা ছোট বড় নমুনা দেয়ালের গায়ে সাজানো। পিছনের ঘরে পাহাড়ের মতো থাক করা। তারপর খোলা আঙ্গিনা। সেখানেই তৈরী হয় ট্রাঙ্কগুলো ৷ রং করা হয়। কোন ছিটার দাগ না থাকে তা দেখে দেখে পরখ করে ঘরের ভেতর পাঠানো হয়।
দশজন কারিগর উদয়াস্ত খাটছে। কারও হাতে ছেনি, কারও বাটালি, কারও হাতুড়ি। কারও বার্নিশ রং। নানান রং। দুহাতের কুড়িটা আঙ্গুলে বাহাদুরি। কারও খাকি সার্ট, কারও ছেঁড়া গেঞ্জি। লুঙ্গি নয়তো খাটো ধুতি পরনে। পনেরো ষোল বছর বয়সের জোয়ানদার থেকে ষাট বছর বয়সের দক্ষ কারিগর। আট জন পুরুষ। দুই জন নারী। নারীরা দুজনই বৃদ্ধা। নারায়ণগঞ্জে সুতার কলে কাজে ঢুকেছিল। সেখানে ববিনে সুতো পরাতে পারেনা চোখের দৃষ্টি কমে আসায়। সেজন্য ট্রাঙ্কের কারখানায় কাজ জুটিয়ে নিয়েছে। একজন পরানের মা। আরেকজন রাধিকার মা। গাল তোবড়ানো। চোখ বসা। কিন্তু দুহাতের কুড়ি আঙ্গুল লোহার সাঁড়াশীর মতো মজবুত। ওদের কাজ ট্রাঙ্কের গায়ে কোন ছিটা দেখা গেলে সেগুলো শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে তুলে দেয়া। বারো আনা, এক টাকা রোজ পুরুষদের দক্ষতা অনুসারে। আট আনা রোজ মেয়েদের।
মহাজন তিরিশ বছর কারবারে দুটো দালান দিয়েছিলো—একটা ঢাকা শহরে, আরেকটা গ্রাম দেশে। চৌকস লোক। পরনে নিমা আর ধুতি। পুরুষ্টু মুখে একটা বড় আঁচিল। মাঝারি বয়সের কারিগর শ্রীপদ ঠন ঠন ঠাঁই ঠাঁইর মধ্যেও রসিকতা করে। রুক্ষ আঙ্গিনাটার সরস করবী গাছটার মতো তার কথাবার্তা। মাঝে মাঝে বলে রাধিকার মা পোর্টমেন্টোর দাগ তুইলা দাও তুমি। মহাজনের আঁচিলটারে ঘইসা তুইলা দিতে পারনা? আঙ্গিনার সবাই এই শত শত বার বলা ফরমায়েশটা শুনে হেসে ওঠে হো হো করে। রাধিকার মা কিন্তু মাতেনা। তার একটা কারণ মহাজন মনিব। দ্বিতীয় কারণ রাধিকার মুখেও আছে ছিটা। হবু বর এসে দেখে মুখ ফিরিয়ে যায়। রাধিকার মায়ের মনের দুঃখ মেয়ের মুখের এই ছিটা। রাধিকার মায়ের তৃতীয় মুশকিলটা হলো তামাক পাতা খেয়ে দাঁতগুলো কালো করেছে। হাসতে গেলে দাঁতের ওপর ঠোঁট দুটো চেপে হাসে। শ্রীপদ একবার রসিকতা করে তার কাছে তেতুল বীচি চেয়েছিল।
আঙ্গিনার সবাই জানে, তাদের মুখে না থাকলেও গায়ে পায়ে অসংখ্য ছিটা ছিটা দাগ। কিন্তু সুটকেস আর ট্রাঙ্কগুলোর গায়ে ছিটা থাকলে চলবে না। যদি থাকে তাহলে মহাজনের গঞ্জনার আগুন অষ্টপ্রহর ছেঁকা দেবে শরীরে। মহাজনের ঢাকাইয়া খিস্তি। মেয়ে মরদ বাছে না। খাটনির কোন মাফ নেই। ‘নাগা’ হলে মজুরীও ‘নাগা’। খাটনি বিহান থেকে রাত ৷
ঠন ঠন ঠাঁই ঠাঁই ঢন ঢন। চড় চড় চড়াৎ। সাতদিন পর কারও তিন টাকা ৷ কারও সাত টাকা পুরো। দক্ষ কারিগর কালকেতু তিরিশ বছর ধরেই রয়েছে এখানে। তিরিশ বছর আগে সে যেমন অবস্থায় ছিল আজও তেমনি আছে। তবে মালিক মহাজন ফুলে ফেঁপে ঢোল ৷ এইটেই নিয়ম। জন্মালে যেমন মরতে হয়, তেমনি। যার বেশী পয়সা, সে বেশী পয়সা টানবে। এইটেই আইন। তবে কয়েক বছর ধরে একটা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments